তাহলে কি আমাদের ঘুমের কোন প্রয়োজন নেই !

আধুনিক বিজ্ঞান নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছে যে, আমরা আমাদের মনে থাকা সকল প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানকে জিজ্ঞেস করি এবং এর উত্তর বিজ্ঞান থেকে পাওয়ার আশা করি । কিন্তু সত্যি কি বিজ্ঞানের কাছে সকর প্রশ্নের উত্তর রয়েছে । অতি সাধারণ কিছু প্রশ্ন থেকে শুরু করে অনেক অসাধারণ প্রশ্নের উত্তরও এখন পর্যন্ত বিজ্ঞান খুঁজে বেড়াচ্ছে । যার উত্তর তাদের কাছেও নেই । এই রকম ১টি অতি সাধারণ  প্রশ্ন  আমরা ঘুমাই কেন ? সত্যি কি আমাদের ঘুমের কোন প্রয়োজন আছে ।  যার উত্তর বিজ্ঞানের কাছেও নেই ।


আমরা ঘুমাই কেন
আমরা ঘুমাই কেন

আমরা ঘুমাই কেন ?

আপনি কি জানেন আপনি যদি ৬০ বছর বেঁচে থাকেন তাহলে তার মধ্যে প্রায় ২০ বছরই আপনি ঘুমিয়ে কাটান । অর্থ্যাৎ আমরা আমাদের জীবনের প্রায় এক - তৃতীয়াংশ সময় ঘুমের মধ্যে কাটাই । এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি সময়ের অপচয় ?  না কি সত্যি ঘুম আমাদের  প্রয়োজনীয় শরীরবৃত্তীয় কাজের অংশ । 

আপনি নিশ্চই এটি জেনে বিষ্মিত হবেন যে, ঘুমের কী কাজ তা বিজ্ঞানীদেরও জানা নেই । বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা শরীর বৃত্তীয় ঠিক কোন কাজের জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন । চলুন এখন সেগুলো সম্পর্কে জেনে আসি ।

আরো পড়তে পারেন

ঘুমের উপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন বিতর্ক

১. ঘুমের উপকারিতা সম্পর্কে শুনে থাকলে শুনে থাকবেন যে, ঘুম আমাদের দেহের ক্ষয় পূরণে কাজ করে । কিন্তু এটি কতটুকু সত্য ? কারণ গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে শারীরিক ভাবে বেশি তৎপর মানুষ, কম তৎপর মানুষের চেয়ে বেশি ঘুমায় না ।  আবার, কিছু সময় ধরে শ্রমসাধ্য ব্যায়াম করলেও মানুষ বেশি ঘুমায় এমনটা দেখা যায় না । এ কারণে বিজ্ঞানীদের কাছে ঘুমের মাধ্যমে শরীরের ক্ষয় পূরণের ধারণাটা বেশি শক্তিশালী মনে হয়নি ।

২. ঘুমের উপকারিতা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ঘুম শক্তি সংরক্ষণে কাজ করে। উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের দেহের ভরের তুলনায় ত্বকীয়-পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল  তাপীয়ভাবে প্রতিকূল । তাই উষ্ণ রক্তের প্রাণীদের দেহের তাপমাত্রা চারপাশের চেয়ে বেশি রাখতে হয় । এই কারণে ভাবা হয় ঘুম প্রাণিদের দেহের তাপমাত্রা সংরক্ষণ করে । 

আমরা ঘুমাই কেন

কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সরীসৃপ ও উভচর প্রাণীদের মতো শীতল রক্তের প্রাণীরাও দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমায় । এমনকি মৌমাছি, মাছি, বাগদা চিংড়ীর মতো অমেরুদন্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে ঘুমের মতো অবস্থা দেখা যায় । এটা ঠিক যে, ঘুমের সময় শক্তির সার্বিক ব্যবহার কমে যায় । তবে তার পার্থক্য বিশ্রামের মাধ্যমে গড় শক্তির ব্যবহারের তুলানায় খুবই কম । তাই ঘুম শক্তি সংরক্ষণে কাজ করে এটি বিজ্ঞান সম্মত নয় ।

আরো পড়তে পারেন

৩. ঘুমের উপকারিতা সম্পর্কে আরেকটি কথা বলা হয়ে থাকে যে, ঘুম প্রাণীর কার্যক্রমকে দিনের নির্দিষ্ট সময় গন্ডীবদ্ধ করে রাখে । দিনের চব্বিশ ঘণ্টার সবটাই প্রাণীর কার্যক্রমের জন্য নিরাপদ নয় । নির্দিষ্ট প্রাণীর জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্যের শিকার না হয়ে খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি । মানুষসহ অনেক প্রজাতির জন্য সেটা হলো দিন । ইঁদুর, পেঁচা, কিংবা বাদুড়ের ক্ষেত্রে সে সময়টি রাত । 

তবে গবেষণার মাধ্যমে দেখা গেছে ঘুম আত্মরক্ষার কোন কৌশল নয় । কারণ, খাদ্য পিরামিডের শীর্ষে থাকা সিংহের মতো প্রাণীরা দিনের বারো ঘণ্টার মতো ঘুমায় । হরিণের মতো প্রাণীরা আবার অতো ঘণ্টা না ঘুমিয়ে খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়ায় । 

বিপরীত ভাবে স্লথ ও কাঠবিড়ালীর মতো কিছু তৃণভোজী প্রাণী দৈনিক বিশ ঘণ্টার মতো ঘুমায়। তাই সব দিক দিয়ে চিন্তা করলে বুঝা যায় ঘুম প্রাণীদের দৈনিক কার্যক্রমকে নির্দিষ্ট সময় গন্ডীবদ্ধ করে রাখে ধারণাটি সন্তোষজনক নয় ।

৪. ২০১৩ সালে বৈজ্ঞানিক জার্নাল সায়েন্সে প্রকাশিত ধারাবাহিক কয়েকটি গবেষণা পত্রে ঘুমের একটি কাজের কথা বলা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে প্রাণীদের সারাদিন কাজের ফলে মস্তিষ্কে কিছু বিষাক্ত উপজাত তৈরি হয় । মস্তিষ্কে তৈরি এই ধরণের বিষাক্ত পদার্থ অপসারিত হতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়।

প্রাণী জাগ্রত অবস্থায় থাকলে মস্তিষ্কের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান মিটিয়ে মস্তিষ্ক থেকে বিষাক্ত উপজাত পদার্থ অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেওয়া সম্ভব নয় । গবেষণায় বলা হয় আসলে ঘুমের সময় মস্তিষ্কে এই পরিষ্কার করার কাজ করে থাকে । 


আমরা ঘুমাই কেন

প্রাণীদের মধ্যে মানুষই তাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে । তাই মানুষকেই সবচেয়ে বেশি ঘুমানোর কথা ।কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা ঘটে না । আমি আগেই বলেছি, স্লথ ও কাঠবিড়ালীর মতো কিছু তৃণভোজী প্রাণী দৈনিক বিশ ঘণ্টার মতো ঘুমায় । তাই বলা যায় ঘুমের ব্যপারে এ তত্ত্বটিও সঠিক নয় ।

আরো পড়তে পারেন

না ঘুমালে কি হয় 

ঘুমাতে না দেওয়ার মাধ্যমে নির্যাতন ইতিহাসে নতুন কিছু নয় । ইতিহাসের বিভিন্ন সময় দেখা গেছে বন্দি বা অপরাধীকে দীর্ঘ সময় না ঘুমাতে দিয়ে তাদের থেকে ইচ্ছে মতো কথা আদায় করা হয়েছে । ১৯৫২ সালে কোরিয়ান যুদ্ধে চীন বাহিনী কর্তৃক আটক হওয়া আমেরিকার সেনাদেরকে দীর্ঘ সময় ঘুমাতে না দিয়ে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের মতো বিভিন্ন যুদ্ধ অপরাধের স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় । 

প্রাচীন রোমানরা কারাবন্দিদের থেকে গোপন তথ্য বের করার জন্য বন্দিদের দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাতে দিতেন না । এমনকি আধুনিক যুগেও বিভিন্ন গণতান্ত্রীক দেশে অপরাধীদের দীর্ঘ সময় ঘুমাতে না দিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা বৈধ । 

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে কী ঘটে দীর্ঘ সময় না ঘুমালে যার কারণে বন্দিরা অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য হয় ?  ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড়্যান্ডি গার্ডনার নামক এক সতেরো বছর বয়সী স্কুল ছাত্র টানা এগারো দিন জেগে ছিলেন । অবশ্য এজন্য তিনি কোন উত্তেেজক ঔষধ গ্রহণ করেন নি । দেখা গেল প্রথম দিকে সে মনমরা, বিষন্ন, অবিচক্ষণ ও খিটখিটে প্রকৃতির হয়ে পড়ে ।

তারপর সে হ্যালুসিনেশন দেখা শুরু করে । অর্থ্যাৎ দীর্ঘ সময় ধরে না ঘুমালে আমাদের মধ্যে কিছু মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ দেখা দিবে ।ঘুমের অভাবে সাময়িক ভাবে আমাদের মধ্যে খানিকটা বিভ্রান্তি, ভারসম্যহীন মানসিক অবস্থা সৃষ্টি হবে । তবে মাত্র কয়েক ঘন্টা ঘুমানোর মাধ্যমে আমরা সে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারি ।  

ঘুম নিয়ে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে ইঁদুর কে টানা তিন চার সপ্তাহ ঘুমাতে না দিলে এগুলো মৃত্যুবরণ করে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসী বাহিনীর ক্যাম্পে বন্দীদের টানা তিন - চার সপ্তাহ ঘুমাতে না দিয়ে হত্যার ঘটনার ইঙ্গিত পাওয়া যায় । 

আমাদের শেষ কথা

আমরা ঘুমাই কারণ ঘুম আমাদের প্রয়োজন । কিন্তু আমাদের  শরীর বৃত্তীয় ঠিক কোন কাজের জন্য ঘুম গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যাখ্যা বিজ্ঞানের কাছে নেই । আশা করি বুঝতে পেরেছেন ।

প্রিয় পাঠক কোন মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয় । তাই কোন ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ভুলগুলো সম্পর্কে জানাবেন । আপনার মতামত সম্মানের সাথে গ্রহণ করা হবে । 

আরো পড়তে পারেন

জুয়েল

আমি বিশ্বাস করি শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক পণ্য নয়। শিক্ষা সকলের অধিকার। আসুন আমরা প্রত্যেক শিশুর স্বপ্ন জয়ের সারথি হই

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন